আমার মা আমার পৃথিবী

0

শিমুল শিকদার | May 12, 2019

নিজের পরিবারের কেউ যে মারা যায়, মারা যেতে পারে তা প্রথম টের পেয়েছিলাম সেই তের চৌদ্দ বছর বয়সে। একদিন সকালে খবর এলো দাদার মৃত্যু হয়েছে। এরপর একে একে আপনজন অনেককে হারিয়েছি। অনেকে চিরতরে চলে গিয়েছে। মৃত্যুর এ যাত্রা প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক। কিন্তু সে মহাযাত্রায় নিজের মা যে যাত্রী হতে পারে তা কখনো, কোনকালে কেউ কি ভাবে? মা কি বিলীন হয়ে যাওয়ার মতো কোন বিষয়? যে গর্ভে আমাদের সৃষ্টি হয়, যে আমাদের ধারন করে, যে আমাদের মেলে ধরে, তুলে ধরে সে কি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মতো কোন বস্তু? সেই ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি, নানান রোগে ভুগছে আমার মা। সে তো সবসময়ই ভুগে। কিন্তু কোন রোগ এসে মাকে কখনো কাবু করতে পেরেছে বলে মনে হয়নি। রোগ এসে লম্ফ ঝম্ফ দিতো ঠিকই। কিন্তু মার কাছে বরাবরই ধরাশায়ী হয়ে ফিরে যেতো। বরাবর তাই তো জেনে এসেছি। মাঝে মাঝে বাবা জোর করে ডাক্তার, কবিরাজ ডেকে আনত। তাঁরা মায়ের তাপ মেপে, কপাল টিপে, নাড়ী দেখে শিশিতে দাগ দিয়ে কি সব ওষুধের ব্যবস্থা করে দিতো। মা ফাল দিয়ে উঠে দাড়িয়ে বলতো, ওসবে আমার দরকার নেই। আমি ভালোই আছি। এই বলে, আবার নিজ কাজে ডুবে যেতো। যেমন ওষুধের শিশি তেমনিই পড়ে থাকতো। কোনদিন সেসব ওষুধে মুখ দিতে দেখিনি। নানান স্বাদের সে সব ওষুধ আমরা ভাই বোনেরা ভাগজোখ করে খেয়ে ফেলতাম।

কিন্তু মা সত্যি সত্যি একদিন হেরে গেলো। মায়ের পরাজয় হলো। নাম না জানা কোন এক অচিন দূর থেকে কি এক অজানা ব্যাধি এসে আমার সুপারম্যান মাকে এভাবে ধরাশায়ী করে ফেলতে পারে, তা কখনো কল্পনায়ও আসেনি। মায়ের এতো বড় এক পরাজয় ঘটে গেলো, অথচ এর কোন লক্ষণ চোখে পড়লো না। মা যেমন শুয়ে থাকে তেমনি শুয়ে আছে। ডাক্তাররা কেমন জানি ফিসফাস করতে লাগলো। কান্নার শব্দে চারিধারের পরিবেশটা তখন অদ্ভুত রকমের ভারী হয়ে উঠলো। সবাই বলছে, মা মরে গেছে। কথাটার অর্থ ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারলাম না। কারন, মৃত্যু তো এক ভয়াবহ, বিভীষিকাময় বীভৎস ব্যাপার। সে বীভৎসতার কোন লক্ষণ মায়ের শরীরে নেই। অনন্তকালের যে মহাযাত্রার যাত্রী সে হয়ে গিয়েছে, তার সে রকম কোন আয়োজনও চোখে পড়লো না। সে তো স্বাভাবিকভাবেই ঘুমিয়ে আছে। গভীর ঘুমে। পার্থক্য শুধু এটুকুই- যে মাকে নিয়ে এতো হৈচৈ, সে শুধু নিশ্চুপ, স্থির, নীরব, শান্ত। এমন তো কখনো ঘটেনি। মায়ের এমন আচরণের সাথে পরিচিত নয়। তার অজানা এই ব্যবহারটা মনের মধ্যে হাতুড়ির আঘাত করতে লাগলো। ঘরের আলোটা ছিল অস্পষ্ট, নিভু নিভু। সেই অল্প আলোতে মার ধবধবে ফর্সা মুখটা ঠিক তেমনি আছে। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করলো, মা তুমি উঠো। সবাইকে বলে দাও, এই দেখো আমি ঠিক আছি। সবাইকে জানিয়ে দাও, মায়েরা মরে না। মায়েরা মরে গেলে সন্তানেরা যে শিকড়বিহীন উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। চুপ করে পাশে বসে রইলাম এই আশায়, মা যে কোন সময় জেগে উঠতে পারে। উঠেই বলবে – তোর মুখটা এতো শুকনা কেন রে, বাবা?

বুঝা না বুঝার কি এক ঘোরের মধ্যে সময়টা কেটে গেলো। ঘোর ভাঙল তখন, যখন মায়ের ঘুমন্ত শরীরটা কাঁধে নিয়ে গোরস্থানের দিকে হাঁটতে লাগলাম। তখন প্রথম মনে হলো, এতো ঘটনার পরেও মা তো শুয়ে থাকার মানুষ নয়। ওঠার হলে সে এতক্ষণে উঠে পড়তো নিশ্চয়ই। এই প্রথম মনে হলো, মা আর উঠবে না। কোন দিনই উঠবে না। কবরের মধ্যে তার শীতল দেহটা রাখা মাত্রই দুর্বিষহ যন্ত্রণার প্রচণ্ড এক দমকা ঝড় মনের মধ্যে হাহাকার তুলে ফেললো। কি তীব্র এক কষ্ট! এ কষ্টের কোন সীমা পরিসীমা নেই। কি অসহনীয় এক বেদনা! এ বেদনা মাত্রাহীন। কি ভয়াবহ এক ক্ষতি!!! এ ক্ষতির পুরন হয় না। কি দুঃসহ এক বিচ্ছেদ! এ বিচ্ছেদের কোন প্রতিকার নেই। এ শোক ভুলে থাকার মতো কোন শক্তি কি পৃথিবীতে আছে?

মৃত্যুর কালো ছায়া এই প্রথম যে মনে দাগ ফেলেছে তা নয়। সে সব দাগ সেই কৈশোর মনে প্রথম ছাপ মেরে গিয়েছিল। কিন্তু কৈশোরে যন্ত্রণা যত তীব্রই হোক না কেন, মনের তলায় গিয়ে এক সময় তা ছায়ার মতো হারিয়ে যায়। কৈশোর মনে কোন দুঃখ স্থায়ী হয় না। কৈশোরের নিয়মই এমন। কিন্তু জীবনের এ কালে এসে মায়ের মৃত্যু মনের উপর বিষাদের গভীর, কালো যে ছায়া ফেলেছে, দিন দিন সে ছায়া যেন আরো ছড়িয়ে যাচ্ছে, সব দুঃখকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখনো মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে মায়ের ফর্সা মুখটা চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হাত বাড়িয়ে তাকে স্পর্শ করতে ইচ্ছে করে। মাকে ছুঁয়ে বলতে ইচ্ছে করে – মা আর একবার শুধু বলো, তোর মুখটা এতো শুকনা কেন রে, বাবা! শুধু একবার।

পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট্ট অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ – মা। এই ছোট্ট শব্দের মানুষটা কেন এতো ছোট্ট সময় নিয়ে পৃথিবীতে আসে? যে মা যার সন্তানের একটা পিঁপড়ার কামড় সহ্য করতে পারে না, সে হঠাৎ কিভাবে সন্তানদের দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে, তাদের জীবনে ভয়াবহ এক শূন্যতা সৃষ্টি করে কাউকে কিছু না বলে চুপিচুপি চিরতরে হারিয়ে যায়? কেন মায়েরা হঠাৎ এতো নিষ্ঠুর হয়ে যায়? সন্তানের মুখের সূক্ষ্ম পরিবর্তন যে মায়ের নজর এড়ায় না, সে মাকে বাদ দিয়েই সন্তানের জীবনে কত শত বিশাল পরিবর্তন ঘটে যায়! তা দেখার কেউ নেই। কান পেতে তা শোনারও আর কেউ নেই।

https://www.facebook.com/md.aktheruzzaman.7/timeline?lst=100001386821385%3A100003151197554%3A1557813969
Share.

About Author

Leave A Reply