নির্বাসনের নয়টি বছর… নয়, পাঁচ, দশ…

0

নয় বছর অনেক দীর্ঘ সময়, অনেক। নয় বছরে কত কত বালক হারিয়ে যায়, বদলে যায় কত কত জীবনের মানে তার হিসেব কেউ রাখে না। মাথার চুল কমার সাথে পাল্লা দিয়ে কমতে থাকে মানুষ, আস্থার হাত, প্রশান্তির চেহারা। আকাশের তারায় হারায় ভালোবাসা, প্রিয় মুখ। ০৯-০৫-১০। নয় বছর আগে এরকম একদিনেই ঘর ছেড়েছিলাম, ছেড়েছিলাম মা মাটি ঠিকানা।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর হুট করে আমার যেদিন অস্ট্রেলিয়ার ভিসা হল আমি তখন কক্সবাজার। ক্লাস আরো আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল তাই ৩ দিনের মধ্যে ফ্লাই করার রিকমেন্ডেশন ছিল এম্ব্যাসি থেকে। এজেন্সি এমনভাবে বললো যে ৩ দিনের মধ্যে সিডনি না পৌছতে পারলে ভিসা ক্যানসেল। কী দরকার বাবা, আমি সবকিছু ফেলে হুড়মুড় করে ঢাকা ফিরে ফ্লাইট বুকিং আর কাগজপত্র বুঝে নিয়ে পরদিন সকালেই চাঁদপুর চলে যাই। সেখান থেকে ইচ্ছে ছিল গ্রামের বাড়ি যাব, দাদার সাথে দেখা করবো, কিন্তু সারাদিন প্রচন্ড বৃষ্টি ঘর থেকে বের হতে পারলাম না। তার উপর খবর পাওয়া গেল গ্রামে যাবার পাকা রাস্তাটা (মেঘনা বাঁধ) প্রলয়ংকারি মেঘনা সম্প্রতি ভেঙ্গে ফেলেছে, এখন প্রায় তিনগুণ রাস্তা ঘুরে যেতে হবে, যেতে আসতে অনেক সময় লেগে যাবে। পরদিন ফ্লাইট, সবাই বললো এভাবে রিস্ক নিয়ে গ্রামে যাবার দরকার নাই। তবুও মন মানে না, আমার দাদার সাথে দেখা হবে না? বিকেলের দিকে সব কিছু উপেক্ষা করে শেষমেশ বের হয়েছিলাম, কিন্তু বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে বুঝতে পারলাম আসলেই গিয়ে এসে রাতের লঞ্চ ধরতে পারবো না।
গ্রামে যাওয়া হলনা, দাদার সাথেও আর দেখা হল না… তাঁর সাথে… আর কোনদিন দেখা হবে না… …

বৃষ্টি কিছুটা কমে এলে সন্ধ্যাবেলা একা একা কিছুক্ষণ চাঁদপুরের রাস্তায় হাঁটলাম। আমার পাড়া, গলি, স্কুল, কলেজ, লেক, নদী, ইলিশ বন্দর। স্কুলে ঢুকে সিঁড়ির গোড়ায় অন্ধকারে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম, কলেজের মাঠে হাঁটলাম। হালকা বৃষ্টির সাথে হটাৎ চুল এলোমেলো করে দেয়া ডাকাতিয়ার শীতল হাওয়া, গাল বেয়ে অবিরত নেমে যাওয়া নোনতা বৃষ্টির উষ্ণতা। স্কুল মাঠের সামনে লেকের উপর অঙ্গীকার ভাস্কর্য, যেখানে আড্ডা দিতাম শহরের দিনগুলোতে সেখানেই কাটলো বাকিটা সময়, কিছু পুরনো স্কুল বন্ধুদের সাথে দেখা হল, মনে হয়েছিল যেন কিছুটা প্রাণ ফিরে পেলাম।

সে রাতেই রওয়ানা দিয়ে ভোরবেলা ঢাকায় নামলাম। খালার বাড়ি টঙ্গীতে, এয়ারপোর্টের কাছে তাই ওখান থেকে রওয়ানা দেব। আব্বু আম্মু আর বাদবাকি সবাই চলে গেল সেদিকে। আরিফকে নিয়ে আমি রয়ে গেলাম কেনাকাটা করতে, কিচ্ছু কেনা হয়নি তখনো, বন্ধু Shihab এসে যোগ দিল কিছুক্ষণ পর। শীতের কাপড় লাগবে, সিডনিতে নাকি মারাত্মক শীত। মে মাসের গরমে সেদ্ধ ঢাকায় শীতের কাপড় কোথায় পাই? যাওয়া হল বঙ্গবাজার, দোতলার গুদামে কাবাব হতে হতে বান্ডিল খুলে কিনলাম শীতের কাপড়। বাংলাদেশ লেখা টি শার্ট লাগবে, সোজা আজিজ সুপার মার্কেট। গরম, জ্যাম ঠেলে কিছু কেনাকাটা করে যখন বসুন্ধরা কমপ্লেক্স থেকে বের হই তখন দুপুর গড়িয়েছে। এর মাঝে মিনিট দশেক সময় নিয়ে টিএসসিসি তে গিয়ে দেখা করে এলাম পুরনো কিছু বন্ধু এবং প্রিয় সংগঠন Nandon Kanon সদস্যদের সাথে। আমি বিদায় নিচ্ছি, তারা তখন পরবর্তী স্টেজ পারফরম্যান্সের রিহার্সাল করছে, অনেক নতুন মুখ। এভাবেই চায়ের পেয়ালাগুলো ভরে যায়, খালি থাকে না কিছুই। অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে, এখনো টিকেট নেয়া হয়নি, ডলার কিনতে হবে। জীবনে সবকিছু একা একাই করেছি, কিছু করার পরে কি করেছি সেটাই শুধু আব্বু আম্মু জানতো। পুরো ভিসা প্রক্রিয়াটাও একা একাই বলতে গেলে করতে হয়েছে, আমি এবং এজেন্সি ছাড়া আর কেউ জানে না কীভাবে কী হয়েছে। নিজের, পুরো পরিবারের এমনকি বন্ধুদের কেনাকাটাও আমিই করতাম। তাই পুরো সময়টাতেই আমার এক হাতে ফোন নিয়ে কথা বলছিলাম আর অন্যহাতে কেনাকাটা করছিলাম।

তখন পর্যন্ত আমাদের খাওয়া হয়নি। দৌড়ে দৌড়ে এক জায়গা থেকে আরেক যায়গায় যাচ্ছিলাম। প্রচন্ড জ্যাম সময়ের সব হিসেব ওলটপালট করে দিয়েছিল। এর মাঝে আরো দুই বন্ধু সূজন এবং আলী চলে এল কাজ কমানোর জন্য। বাধ্য হয়ে তাদের সবাইকে কিছু কিছু কাজ ভাগ করে দিয়ে গেলাম পল্টনে স্কুলবন্ধু সোহাগের ট্রাভেল এজেন্সিতে টিকেট নিতে। কি যেন একটা ঝামেলা ছিল সার্ভারে, টিকেট বের করা যাচ্ছিল না। আমি আর সোহাগ একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে ঘামছি। টিকেট হাতে পেতে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক লাগলো। বিকেল হয়ে গেছে, রাত পৌনে একটায় ফ্লাইট। অথচ আমার এখনো বাসায় ফেরাই হয়নি। অনেকের সাথে দেখা করার কথা ছিল, অনেক বাসায় যাবার কথা ছিল কিচ্ছু হয়নি। একের পর এক কল আসছে, কেউ অভিমান করছে, কেউ কষ্ট পাচ্ছে, কেউ কাঁদছে, আমি দাঁতমুখ শক্ত করে অদ্ভুত নির্বিকার হয়ে সেসব কথার জবাব দিতে দিতে এদিক সেদিক ছুটছি।

টিকেট হাতে পেয়েই দৌড়ে গেলাম ডলার কিনতে। অভাগা যেদিকে যায় সমুদ্র শুকিয়ে যায় সেটা প্রমাণ করতেই যেন আমি যে পরিমাণ অস্ট্রেলিয়ান ডলার কিনতে চাইছিলাম সে পরিমাণ ওখানে কোন দোকানেই ছিল না, অস্ট্রেলিয়ান ডলার কেউ বেচে না। আবার দৌড়ে গেলাম অন্যদিকে। কাজ শেষে একটা সিএনজি মোটামুটি হাতে পায়ে ধরে রাজী করিয়ে রওয়ানা দিলাম টঙ্গীর উদ্দেশ্যে। সারাদিনে যেন এই প্রথম স্থির হয়ে বসার সুযোগ পেলাম। আমার এখনো মনে আছে প্রচন্ড ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছিলাম, চুল থেকে টপটপ করে ঘাম পড়ছিল, চোখ জ্বালা করছিল থেকে থেকে, হাত এত পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল যে ঠিকমত সিএনজির রেলিং ধরতে পারছিলাম না। পল্টন থেকে টঙ্গী, সেটা ছিল একটা পুলসিরাত, দীর্ঘতম এক রাস্তা। ফোনে হাজারো কৈফিয়ত দিতে দিতে যখন খালার বাসায় গিয়ে পৌছালাম তখন রাত ৯ টা বাজে। পুরো বাড়ি লোকে লোকারণ্য, অল্প সময়ের নোটিসে যে পেরেছে চলে এসেছে।
মা খালা ফুফু মামি মিলে খুব দ্রুত লাগেজ গুছিয়ে ফেললো। গোসল করে এক একজনের সাথে কথা বলছি আর আম্মু ছোটবেলার মত সাথে হেঁটে হেঁটে এটা সেটা খাইয়ে দিচ্ছে। জামাকাপড় পরতে গিয়ে দেখি তাঁরা তাড়াহুড়োয় সবকিছু প্যাক করে ফেলেছে, এমনকি আমার আন্ডারওয়্যারও। কী একটা বিপত্তিকর অবস্থা। আরিফ তার নতুন কেনা আন্ডির সত্ত্ব ত্যাগ করে সে যাত্রায় মান বাঁচালো । রাতের খাবারের আয়োজন হয়েছিল বড় মামার বাসায়, সে বাড়ি খুব কাছেই ছিল তাই রক্ষা। মনে হচ্ছিল যেন চোখের পলকে সময় শেষ হয়ে এল।

এয়ারপোর্টে যখন সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলাম কেমন যেন অনুভূতিহীন হয়ে গিয়েছিলাম। পিচ্চি ছোট ভাইটাকে অনেক কিছু বুঝ দিয়ে কোল থেকে নামাতেই যা একটু কষ্ট হয়েছিল। আমার মা আমাদের সামনে এর আগে কোনদিন কাঁদেনি, তবুও সেদিন আর আটকাতে পারেননি। ফুফুরা কাঁদছিল হু হু করে। আমি হাসিমুখেই সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলাম, বলেছিলাম, এইতো বছর ঘুরতেই ফিরে আসবো…

বিমানে বসার পরেই ঝপ করে অন্ধকার নেমে এল হাসিমুখের মুখোশ খুলে। আশেপাশের সব শব্দ কেমন যেন থেমে গিয়েছিল, মনে হচ্ছিল দূর থেকে ভেসে ভেসে আসছে প্রিয়জনদের শেষ কথাগুলো। হয়তো তাদের অনেকের সাথেই আর কোনদিন দেখা হবে না প্রকৃতি জেনে গিয়েছিল।
যাদেরকে ফোন দিতে পারিনি তাদের অনেককেই ফোন দিচ্ছিলাম এমনকি বিমান রানওয়েতে চলা শুরু করার পরেও লুকিয়ে কথা বলছিলাম। সবশেষে কথা বলছিলাম বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং ক্লাবের সদস্যদের সাথে। সজল ভাইয়ের (Sajal Khaled) সাথে কথা হল, নিজেই ফোন দিয়েছিলেন সারাদিনে কয়েকবার। ক্লাবের পার্টি দিতে চেয়েছিলেন অথচ সময় মিললো না। কথা হল প্রাণের বন্ধু রানার (Mir Asif Hossain) সাথে, আমার স্কুবা ডাইভিং গুরু হামিদ ভাইয়ের সাথে কথা হল শেষবারের মত। কে জানতো হাতের ছোঁয়ায় লেগে থাকা প্রিয় এই মানুষগুলোর সাথে জীবনে আর কোনদিন দেখা হবে না… …

রানওয়ে পেরিয়ে শূন্যে নাক ভাসালো বিশাল যন্ত্রদানব। চাইনিজ এয়ার হোস্টেস ভদ্রমহিলা অনেকটা জোর করেই ফোন বন্ধ করালো। কে জানে কী বুঝেছিল, পাশে এসে খুব কোমল স্বরে বললো, মন খারাপ কোর না আবার তো ফিরেই আসবে, তখন সবার সাথে দেখা হবে। তিনদিনের টানা ছুটাছুটির পর হঠাৎ প্রচন্ড অবসর। গোল জানালায় ধীরে ধীরে প্রিয় স্বদেশের সব আলোগুলো নিভে গেল একে একে। বুকের মধ্যে কেমন এক ধরণের শূন্যতা আর হাহাকার নিয়ে ড্রাগন এয়ারের পেটে বসে একসময় অন্ধকার আকাশে হারিয়ে গেলাম।
গন্তব্য দূর অজানা…

(to be continued)
~ফাহাদ আসমার। সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।

https://www.facebook.com/FahadASMAR01

Share.

About Author

Leave A Reply